ভোলায়  ইয়াসের  প্রভাবে নিন্মাঞ্চল প্লাবিত ॥ ঘড়-বাড়ী বিধ্বস্ত ॥ পানিবন্দী কয়েক হাজার মানুষ। 

ভোলা প্রতিনিধি ॥ বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছে ভোলা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত মেঘনা নদী। সকাল থেকে থেমে থেমে বইছে ঝড়ো বাতাস, সেই সঙ্গে রয়েছে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টি। ঝড়ের প্রভাবে মেঘনার পানি বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে ঘণ্টায় বাতাসের গতিবেগ ১৪ কিলোমিটার বেগে প্রবাহিত হচ্ছে। বাতাসের সাথে সাথে জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচর, কুকরী-মুকরি ও চর পাতিলা, দৌলুতখানের সৈয়দপরসহ মনপুরার বেশ কিছু নিচু এলাকা। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় কয়েক হাজার পরিবার। জোয়ারের পানিতে ঢালচরসহ নিম্মাঞ্চলের ঘরবাড়ি ধ্বসে পড়ার খরর পাওয়া গেছে।
ঢালচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম হাওলাদার বলেন, ঢালচর ইউনিয়নটি এখন ৬ ফুট জোয়ারের পানিতে একেবারে ডুবে গেছে। এতে সকাল থেকে এ-ই পর্যন্ত ২৫ টি ঘর-বাড়ি ধ্বসে পড়েছে এবং প্রায় সাত শতাধাকি ঘর বাড়ি আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। রাস্তা ঘাট সব পানির নিছে ডুবে গেছে। এতে এখন মানুষ পানি বন্দি হয়ে পরেছেন।
বুকরি-মুকরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হাসেম মহাজন জানান, অতিজোয়ারে পুরো এলাকা তলিয়ে গেছে। রাস্তা-ঘাট, মাছের ঘেরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তলিয়ে গেছে।
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন বলেন, এসব চরাঞ্চল থেকে লোকজন নিরাপদে সরিয়ে আনার জন্যে মোট ১৫টি ট্রলার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতি ইউনিয়নের আশ্রিতদের খাবারের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে বরাদ্দ হয়েছে। তবে এখনও দেওয়া হয়নি।
লালমোহন উপজেলার ইউএনও আল নোমান বলেন, তারা খাবার সংগ্রহের জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। খাবারের মজুদ করতে বলেছেন। যেন দরকারে সংকট না পড়ে। চারটি ট্রলার রাখা হয়েছে পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের জন্য। যদি কোনো খারাপ ইঙ্গিত পাই, যেন ব্যবস্থা নিতে পারি।
এদিকে মনপুরায় ঘূর্ণীঝড় ইয়াস এর প্রভাবে জোয়ারের পানির তোড়ে ৬ মিটার বেড়ীবাঁধ ভেঙ্গে বিস্তৃর্ণ এলাকা প্লাবিত। এছাড়াও মেঘনার পানি বিপদসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর প্রবাহিত হওয়ায় নি¤œাঞ্চলসহ বেড়ীর বাহিরের ৭ গ্রাম ৪-৫ ফুট জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে ওই সমস্ত এলাকার ৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে মনপুরা থেকে বিচ্ছিন্ন চরকলাতলী ও চরনিজামের নি¤œাঞ্চল ৫-৬ ফুট জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে ভাঙ্গন কবলিত বেড়ীবাঁধ স্থানীয় চেয়ারম্যান শাহরিয়ার চৌধুরী দীপকের নেতৃত্বে পানি উন্নয়ন বোর্ড মেরামত করতে দেখা গেছে।
মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২ টায় মেঘনার পানি বিপদসীমার ওপর প্রবাহিত হয়ে উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের বাউল বাড়ি সংলগ্ন ৬ মিটার বেড়ীবাঁধ ভেঙ্গে যায়। এছাড়াও জোয়ারের পানিতে সোনারচর, চরযতিন, দাসেরহাট, চরজ্ঞান, কাউয়ারটেক, কূলাগাজী তালুক, নায়বের হাট, আলমনগর গ্রাম প্লাবিত হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানাগেছে, উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের দাসেরহাট, নায়বেরহাট, সোনারচর, চরযতিন, চরজ্ঞান গ্রাম, উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের আলমনগর ও মনপুরা ইউনিয়নের কাউয়ারটেক ও কূলাগাজী তালুক গ্রামের বেড়ীর বাহিরের এলাকা ৪-৫ ফুট জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। এছাড়াও হাজিরহাট ইউনিয়নের জোয়ারের পানিতে দাসেরহাট জামে মসজিদ ও চরযতিন পুরাতন থানা মসজিদ ও শত শত ঘর-বাড়ি প্লাবিত হয়। ঘরের মধ্যে জোয়ারে পানি প্রবেশ করায় পানিবন্দি হয়ে ঘর থেকে বের হতে পারছেনা হাজার হাজার মানুষ। অনেকে নৌকা করে ঘর থেকে বের হতে দেখা গেছে। অন্যদিকে উপজেলা সদরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর জোয়ারের পানি প্লাবিত হয়। এছাড়াও উপজেলার রামনেওয়াজ এলাকার লঞ্চঘাট জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ শামীম মিঞা জানান, জোয়ারে নি¤œাঞ্চল ৪-৫ ফুট প্লাবিত হয়েছে। দুর্গত এলাকায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শুকনো খাবারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছ। এছাড়াও ভেঙ্গে যাওয়া ৬ মিটার বেড়ী বাঁধ মেরামতে পানি উন্নয়ন বোর্ড উদ্যোগ গ্রহন করেছে।
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এর ডিভিশন-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ জানান, জোয়ারের তোড়ে ভেঙ্গে যাওয়া বেড়ীবাঁধ মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মেঘনার পানি বিপদসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর প্রবাহিত হওয়ায় নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
এদিকে প্রশাসন দুর্গম চরাঞ্চলে বসবাস করা মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে আনার জন্যে পর্যাপ্ত ট্রলার এবং শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। সরকার প্রতি ইউনিয়নে দুর্যোগকালে শুকনো খাবারের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে বরাদ্দ করেছে।
ভোলার জেলা প্রশাসক তৌফিক-ই-লাহী চৌধুরী জানান, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সকল ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ৪০টি চরাঞ্চলের তিন লাখ ১৬ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসতে সকল ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। পানিবন্দি মানুষকে শুকনো খাবার বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও প্রতিটি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বেশ কিছু নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। ও-ই সকল উপকূলের মানুষকে নিরাপদে আনার কাজ শুরু হয়েছে।

আরও পড়ুন

Friday, October 7, 2022

সর্বশেষ