লক্ষ্মীপুরের জন প্রিয় দর্শনীয় স্থান সমুহ :

লক্ষ্মীপুরের আনাচে-কানাচে ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন। যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এ সব প্রাচীন শিল্প ও স্থাপত্যের পর্যটন মূল্য বাড়ানো সম্ভব। আর এর জন্য প্রয়োজন
জনসচেতনতা সৃষ্টি ও সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।

রামগতি :

রামগতি বাজারের দক্ষিণে মেঘনা নদী বঙ্গোপসাগরে পড়েছে, যার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং দেখতে অনেকটা প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকতের
মত। একজন পর্যটক রামগতিতে মেঘনার বুকে জেলেদের ইলিশ মাছ ধরার অনাবিল সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে।
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত, নদীর বুকে নৌকার সারি আর কেয়া গাছের সবুজ বেষ্টনীর অপরূপ শোভা রামগতির বৈশিষ্ট্যে বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। রামগতি ঐতিহ্যবাহী মহিষের
দই ও মিষ্টির জন্য বিখ্যাত।

ঐতিহ্যবাহী দালাল বাড়ী :

লক্ষ্মীপুর জেলা সদর থেকে ৫ কি.মি. পশ্চিমে রায়পুর-ঢাকা মহাসড়কের পাশে দালাল বাজারে প্রায় ৫ একর জমির উপর ঐতিহ্যবাহী দালাল বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ দাঁড়িয়ে আছে। ঐতিহ্য মতে, আজ থেকে ৪০০ বছর আগে ভুলুয়া রাজ্যাধীন ল²ীপুর পরগনাতে গৌর বংশের কিছু লোক যুগি/কাপড়ের ব্যবসার প্রসার ঘটায়। ইতিমধ্যে ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে বাণিজ্য ঘাঁটি গড়ে তুললে গৌর বংশের লোকেরা তাদের
এজেন্ট হিসেবে সুবিধা পায়। আর সেই সুবাদে জনৈক গৌরি কিশোর রায় চৌধুরী দালাল বাজারে ব্যবসা কেন্দ্র স্থাপন করে এবং তার ছেলে নলিনী কিশোর রায় চৌধুরী জমিদারিত্ব ক্রয় করে। কিন্তু তা সত্তে¡ও এই জমিদার
বাড়ীটি দালাল বাড়ী নামে পরিচিত হয়।
১৯৪৭-এর সা¤প্রদায়িক দাঙ্গার পরে তার বংশধরেরা সম্পদ ভূ-সম্পত্তি বিক্রি করে কলকাতায় চলে যায় এবং চরে তাদের সম্পত্তি সরকারি খাস জমির অন্তর্ভুক্ত হয়। বিশাল এই জমিদার বাড়ীর রাজগেটের ভেতরে একাধারে রাজ প্রাসাদ ও জমিদার প্রাসাদ, অন্দর মহল প্রাসাদ, অন্দর কুয়া, শান বাঁধানো ঘাট, পুকুর ও পূজামণ্ডপ রয়েছে।

কামান খোলা বাবুর বাড়ী :

আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে তৎকালীন ভুলুয়ার জমিদারী থেকে জনৈক লক্ষ্মীনারায়ণ ভূঞা জমিদারী বন্দোবস্ত নেন এবং একই সাথে দালাল বাড়ীর অর্ধেক জমিদারী কিনে নিয়ে এখানেই
বসতি স্থাপন করেন। এটিই কামান খোলার জমিদার বাড়ী নামে পরিচিত। জমিদার ল²ী নারায়ণের পৌত্র যদুনাথের পালিত ছেলে (বাবু হরেন্দ নাথ)-র ঘরের নাতী দুলাল বাবু বর্তমানে দেবত্ত সম্পদের মালিকানা নিয়ে ধবংসাবশেষের
মধ্যে অবস্থান করছেন। বাড়ীর সদর দরজায় কাল পাড়ের লাঠিয়াল ও রক্ষীবাহিনীর প্রাসাদ, রক্ষীবাহিনীর আবাস ও পূজামণ্ডপ নিয়ে গঠিত প্রাসাদ ও ভেতর বাড়ীর প্রাসাদ ভবন এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই ভেতর
বাড়ীর রাজ প্রাসাদে ভূ-গর্ভস্থ নৃত্যশালা ও সালিশ কক্ষ বা “আধার মানিক” নামের কক্ষটিতে গুপ্তধন রয়েছে বলে লোকে বিশ্বাস করে। ১৩৫২ সালে হরেন্দ্র বাবুর মৃত্যু শেষে তার প্রিয় পোষা হাতিটিও মারা যায়। আর সেই হাতির হাঁড় এখনো এই প্রাসাদে সংরক্ষিত আছে।

সাহেববাড়ী বা নীলকুঠি :

১৭শ শতাব্দীর শেষার্ধে ইংরেজরা তৎকালীন বৃহত্তর নোয়াখালী জেলায় নীল উৎপাদন শুরু করে। তারা ল²ীপুরের বাঞ্চানগর বাঘ বাড়ীর পেছনে স্থায়ী কুঠি স্থাপন করে নীলকর উঠানো শুরু করে।
১৯৩০ সালে নীলকরেরা ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে জনৈক হিন্দু ডাক্তারের কাছে বাড়ীটি বিক্রি করে দেয়। জনশ্র“তি মতে, এই ডাক্তার সারা বাংলার দুইজন বিখ্যাত আকুপাংচার বিশেষজ্ঞের একজন ছিলেন এবং তিনি আইসিজেডএমপি ল²ীপুর
৪০ উদ্যোগে সেই কুঠিতে একটি ল্যাবরেটরি ও হাসপাতাল গড়ে তোলেন। ডাক্তারী যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ আলমিরাটি আজও সেই স্মৃতি বহন করে চলেছে।

জ্বীনের মসজিদ :

আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে দিল−ীর জামে মসজিদের আদলে ল²ীপুরের রায়পুরে জ্বীনের
মসজিদ স্থাপিত হয়। নদী ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে নোয়াখালীর সুধারাম থানা থেকে জনৈক মুন্সী রহমতউল্ল্যাহ তালুকদার রায়পুরে বসতি স্থাপন করেন। তারই ছেলে আব্দুল−াহ (রা:) দেওবন্দ মাদ্রাসায় লেখাপড়া শেষ করে পবিত্র ইসলাম ধর্ম প্রচারণায় আত্মনিয়োগ করেন। কালক্রমে বুজুর্গ লোক হিসেবে সুখ্যাতি অর্জনকারী এই ব্যক্তির পুত্র মোহাম্মদ সাহেবও দেওবন্দে লেখাপড়া শেষ করে পিতার প্ররোচনায় মসজিদটি নির্মাণ করেন। অতি স্বল্প সময়ের
মধ্যে ইট তৈরি, মসজিদ নির্মাণ, বড় দীঘি ও দক্ষিণের দীঘি খননের বিষয়টি জনমনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে এবং মসজিদটি জ্বীনের তৈরি বলে বিশ্বাস করে। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট সুউচ্চ প্রাচীর পরিবেষ্টিত মসজিদের দক্ষিণ অংশে মাটির নীচে একটি কুঠুরী আছে। অতি পুরনো ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য কলায় নির্মিত এই মসজিদটির পর্যটন মূল্য
অপরিসীম।

ধোলাকান্দি জামে মসজিদ :

তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত মাওলানা ইমামউদ্দীন (রা:) বাঙালী সাহেব ১৮৩২ সালে ল²ীপুরের ৭ নং বাঙা খাঁ ইউনিয়নের ধোলাকান্দি গ্রামে এই জামে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই মসজিদটি প্রাচীন স্থাপত্য কলার নির্দশন সম্পন্ন ও ১৬৬ বছরের পুরানো।

রায়পুর বড় জামে মসজিদ :

১২১৭ সালে হযরত শাহ্ ফজলুল−াহ রায়পুর উপজেলায় রায়পুর জামে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। জনশ্র“তি মতে, কোন এক সময়ে তার পূর্বপুরুষরা স›দ্বীপের দিললে রাজার সাথে বাগদাদ থেকে স›দ্বীপে আসেন এবং ১২০০ সালের দিকে শাহ ফজলুল−াহ রায়পুরে বসতি স্থাপন করেন। জনসাধারণের অনুরোধে কোরআন-হাদিসের শিক্ষা দেবার জন্য তিনি রায়পুরে থেকে যান। একটি খড়ের ঘর থেকে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি এই ঐতিহাসিক ২৩ গম্বুজ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে একত্রে ৫০০ জন মুসল্লী নামাজ আদায়ে সক্ষম। জেলার ধর্ম প্রসারের ইতিহাস নির্ভর এই মসজিদটির প্রতœতাত্তি¡ক ও ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম।

মান্দারী বাজার বড় জামে মসজিদ :

আজ থেকে ১১০ বছর পূর্বে মুন্সী হাসমত উল−্যাহর উদ্যোগে ল²ীপুরের মান্দারী বাজারে এই জামে মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মসজিদটির নির্মাণ-শৈলী অর্থাৎ সুউচ্চ মিনার ও মনোরম পরিবেশে আকৃষ্ট হয়ে সারা বছর ধরে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এটি দেখতে আসে। হযরত মিরান শাহ (রা:) সাহেবের মাজার : ল²ীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চনপুর গ্রামে মিরান শাহ-এর মাজার অবস্থিত, যেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন ভক্তরা মাজার জিয়ারতের জন্য আসেন। বাগগাদের বড় পীর হযরত সৈয়দ মহীউদ্দিন আবদুল কাদের জিলানী (রা:)-র পুত্র হযরত মাওলানা সৈয়দ আজাল−া (রা:)-র ঘরেই দিল−ীতে সৈয়দ হাফেজ মাওলানা আহমদ আমুরী তাওয়াকেল−ী বা হযরত মিরান শাহের জন্ম। তিনিই পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজধানী পাণ্ডুয়া হয়ে সিলেটে আগমন করেন। তারপর ঢাকা হয়ে নোয়াখালী অঞ্চলে আসেন এবং সাথে ছিল তার বোন বিবি মজযুবাসহ আরো ১২ জন সুফী সাকি। ইসলাম ধর্ম প্রচারের সময় তিনি অনেকভাবেই বাঁধাগ্রস্ত হন। কিন্তু নিজ আধ্যাত্মিক শক্তি ও অলৌকিক ক্ষমতাবলে তিনি সে সব উতরে যান। সমগ্র নোয়াখালী অঞ্চলে এই ভাই বোনের মাজারের প্রতি জনগণের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস রয়েছে। এই মাজারে বহু লোকের মনবাসনা পূর্ণ হয়েছে অর্থাৎ মাজারটি আধ্যাত্মিকভাবে বিখ্যাত।
শামপুর দায়রা শরীফ : ১২২২ সালে রামগঞ্জ উপজেলার শামপুরে শাহ্ সুফী সৈয়দ জকিউদ্দীন আল হোছাইনী আল কাদেরী আল চিশতী (রা:) শামপুর দায়রা শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতি বছর (বাংলা) মাঘ মাসের দ্বিতীয়
আইসিজেডএমপি লক্ষ্মীপুর ৪১ শুক্রবার তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ছয় দিনব্যাপী ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয় ও এতে দেশ-বিদেশ থেকে প্রায় লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়। এটি লক্ষ্মীপুরের একটি উলে−খযোগ্য দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

রামগতির হাট দায়রা শরীফ :

আঠার শতাব্দীর শেষার্ধে স›দ্বীপের সুফী সাধক হযরত চাঁদ শাহ্ ফকির চর মেহের বা রামগতিতে এই দায়রা শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন। এই চাঁদ শাহের পূর্ব পুরুষরা দশম শতাব্দীর পরে আরব থেকে স›দ্বীপে আসেন। রামগতির একটি ঐতিহাসিক ও পবিত্র স্থান বলে পরিচিত এই দায়রা শরীফে লক্ষ্মীপুর জেলাবাসী যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মুক্তির আশায় দোয়া/প্রার্থনা করতে ছুটে আসেন। এ ছাড়া রায়পুরে মুসলিম সভ্যতার গোড়াপত্তনকারী পীর হযরত মাওলানা ফজলুল হক বাগদাদী (রা:) ও তার সুযোগ্য পূত্র পীর হযরত মাওলানা বড় মিয়া সাহেব (রা:) -এর মাজার জেলার প্রসিদ্ধ একটি স্থান।

 

 

 

আরও পড়ুন

Friday, October 7, 2022

সর্বশেষ